রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবার আকুল আর্তনাদ ও দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন। গত ৬ দিনে ৪ শিশু হত্যার ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও বর্তমান আইন ব্যবস্থা।
“একটি স্বাধীন জাতির স্বাধীনতার ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে আদালতের ওপর আস্থা অপরিহার্য। আর এই আস্থা তখনই ভেঙে পড়ে, যখন দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার বঞ্চিত হয়।” — ওয়ারেন ই. বার্গার (সাবেক প্রধান বিচারপতি, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট)
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতির এই ঐতিহাসিক বক্তব্যের গভীরতা যদি আমরা মাপতে চাই, তবে বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজধানীর পল্লবীতে ঘটা ৮ বছরের শিশু রামিশা হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবার আকুল হাহাকারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।
সন্তানের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে রামিসার বাবা চরম ক্ষোভ আর হতাশায় গণমাধ্যমকে বলে দিয়েছেন— “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।”
একটা রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর কতটা অনাস্থা তৈরি হলে, ক্ষোভের পারদ কতটা উঁচুতে উঠলে সন্তানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে একজন বাবা এমন নির্মম সত্য উচ্চারণ করতে পারেন? কিন্তু এমন ঘটনা তো এ দেশে প্রথম নয়। এর আগেও বহু মর্মান্তিক ঘটনায় স্বজনদের বিচার না চাওয়ার এমন অসহায়ত্ব আমরা দেখেছি। তাতেও কি কিছু যায় আসে আমাদের? রাষ্ট্র বা সরকারের কর্ণধারদের?
পল্লবীর সেই অভিশপ্ত সকাল
শিশু রামিসাকে এখন সবাই চেনে। তবে তার বাবার আশঙ্কাই সত্যি—কয়দিন পর আমরা সবাই চিরাচরিত নিয়মে তাকে ভুলেও যাব। রামিসাকে আজ সবাই চেনে, কারণ সে এখন আর বেঁচে নাই।
সেদিন সকালে বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু সকাল থেকেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাশের বাসার দরজার সামনে পাওয়া গেল তার ছোট্ট স্যান্ডেল জোড়া। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। ভাবা হয়েছিল, হয়তো প্রতিবেশীর বাসায় খেলতে গিয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের সূত্রে আমরা যা জানতে পারছি, তা একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে মানসিকভাবে সহ্য করা কঠিন।
পাশের বাসার সেই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ। আর আরেকটি কক্ষের ভেতরে বালতির মধ্যে রাখা ছিল তার বিচ্ছিন্ন মাথা! দরজা ধাক্কাধাক্কির কারণে লাশ লুকানোর সময় পায়নি ঘাতক; জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সে। পরে অবশ্য নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক ঘটনার দায় স্বীকার করেছে।
পরিবার ও পুলিশের বক্তব্যে প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট যে, শিশুটি নৃশংস যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—ওই ফ্ল্যাটে ঘাতকের সঙ্গে তার স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। স্ত্রীর দাবি, তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছিলেন; কিন্তু স্বামীকে পালিয়ে যেতে ও লাশ লুকাতে তিনি সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে আমাদের শিশুদের চারপাশের নিরাপত্তাহীনতা আসলে ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।
পরিসংখ্যানের চোখে বিচারহীনতার ১ সপ্তাহ
রামিসার বাবার এই অনাস্থা কোনো আকস্মিক ক্ষোভ নয়, বরং এটিই এ দেশের প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সময়ের মাত্র ৬ দিনের একটি খতিয়ান দেখলেই গা শিউরে ওঠে:
| তারিখ (২০২৬) |
স্থান |
ঘটনার বিবরণ |
| ১৪ মে |
ঠাকুরগাঁও |
৪ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা; প্রতিবেশী কিশোর আটক |
| ১৬ মে | মুন্সীগঞ্জ |
শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ; আটক ১ |
| ১৭ মে | দুর্গাপুর |
অপহরণের পর শিশুকে হত্যা; লাশ নিয়ে স্থানীয়দের সড়ক অবরোধ |
| ১৯ মে | মিরপুর |
শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা |
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, রামিসার বাবার কথাই এ দেশের চরম বাস্তবতা। খুব সম্ভবত ‘বিচার’ শব্দটাই এখন এ দেশে ভিক্টিমের জন্য সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাসে পরিণত হয়েছে।
আমাদের আইনি কাঠামোর গলদ আর দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে ধর্ষণের আসামিরা অনায়াসে জামিনে বেরিয়ে আসছে। এরপর তারা আবারও একই অপরাধ করছে, খুন করছে। এই চক্রাকার নির্মমতা মূলত আমাদের পুরো ‘সিস্টেম’ বা বিচারিক ব্যবস্থার ভেঙে পড়াকেই নির্দেশ করে। রাষ্ট্র যদি এখনই এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারে, তবে রামিসার বাবার মতো প্রতিটি নাগরিকের মন থেকেই ‘রাষ্ট্র’ ও ‘ন্যায়বিচার’ শব্দ দুটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...