1ef41a04-0e40-44ac-8c99-5303a719e024.webp
নিউজ টাইম
৫ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ০১:৩৬

অভিযুক্ত বিএনপি নেতা দীপক কুমার বর্মন
অভিযুক্ত বিএনপি নেতা দীপক কুমার বর্মন

নরসিংদীতে শীতলাবাড়ি মন্দিরের সরকারি টিআর প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, ওএমএস ডিলারশিপের নামে প্রতারণা ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ জেলা বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে।

নরসিংদীতে মন্দিরের উন্নয়নের নামে সরকারি বরাদ্দকৃত টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে।


অভিযুক্ত ওই নেতার নাম দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স), যিনি নরসিংদী জেলা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক এবং জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।

একই সাথে ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) ডিলার নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে লাখ টাকা আত্মসাৎ, বিভিন্ন মন্দিরের কমিটি করে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়সহ একাধিক মামলাবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে এই নেতার বিরুদ্ধে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই স্থানীয় হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে।


কাগজে-কলমে বরাদ্দ ও বাস্তব চিত্র:

নরসিংদী সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার নথি সূত্রে জানা গেছে—চলতি বছরের ৫ এপ্রিল পৌর শহরের বৌয়াকুড় এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শীতলাবাড়ি মন্দির’ এর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লক্ষ ১৭ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়। বিধি মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জেলা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স) কে সভাপতি, সঞ্জয় ধরকে সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা ছাত্র দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক কিশান দাস পার্থ, সজয় দাস ও তুষার দাসকে সদস্য করে একটি ৫ সদস্য বিশিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে ৫ এপ্রিল পৌর প্রশাসক, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে এই কমিটির অনুমোদনও দেওয়া হয়। নথিপত্র অনুযায়ী—প্রকল্প কমিটির সভাপতি হিসেবে দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স) এর নামে ইস্যুকৃত ১ লক্ষ ১৭ হাজার টাকার সরকারি চেক গত মে মাসের ১১ তারিখে উত্তোলন করা হয় এবং কাগজে-কলমে তা মন্দিরের উন্নয়নে ব্যয় দেখানো হয়। তবে বাস্তবে মন্দির কমিটির সদস্যরা এই বরাদ্দের এক টাকাও পাননি।


স্বাক্ষর জালিয়াতি ও জালিয়াতির কমিটি:

অনুসন্ধানে জানা গেছে—বিএনপির এই নেতা মন্দিরের নামে বরাদ্দ করা পুরো অর্থই আত্মসাৎ করেছেন। নিজের বানানো প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি কমিটির সদস্যদের নাম ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করেছেন তিনি নিজেই। নিজ নামে চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করার পরও শীতলা বাড়ি মন্দির কমিটির মূল সভাপতি সুশীল চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক অখিল দাসসহ অন্যান্য সদস্যরা বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিন্স তাদের জানান—"বরাদ্দের টাকা এখনো পাওয়া যায়নি, পেলে জানানো হবে।"


মন্দিরের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় হতবাক মন্দির কমিটিসহ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এ বিষয়ে শীতলা বাড়ি মন্দির কমিটির সভাপতি সুশীল চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক অখিল দাস জানান—তারা মন্দিরের উন্নয়ন কাজের জন্য পৌরসভায় অনুদানের আবেদন করেছিলেন, কিন্তু এ পর্যন্ত মন্দিরের নামে কোনো সরকারি অর্থ তারা পাননি। মন্দির কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—"লোকমুখে শুনছি কে বা কারা মন্দিরের নামে টাকা এনেছে, কিন্তু আমরা কোনো টাকা পাইনি।" তারা অর্থ আত্মসাতকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সরকারি টাকা মন্দিরে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


এদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য তুষার দাস জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ করে বলেছেন—"অভিযুক্ত দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স) প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাবিত ফর্মে আমাকে না জানিয়ে আমার নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেছে। এমনকি আমার স্বাক্ষরও জাল করে উক্ত ফর্মে আবেদন করেছে। আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না।" তিনি জনস্বার্থে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুদানের অর্থ আত্মসাতকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকারি টাকা উদ্ধার করে মন্দিরের তহবিলে হস্তান্তরের জন্য বিনীত প্রার্থনা জানিয়েছেন।


ওএমএস ডিলারশিপের নামে প্রতারণা ও আশ্রমের কমিটি বাণিজ্য:

অভিযুক্ত দীপক কুমার বর্মণের বিরুদ্ধে প্রতারণার জাল অনেক দূর বিস্তৃত। বৌয়াকুড় এলাকার বাসিন্দা বলাই নামে একজন ভুক্তভোগী জানান—"আমাকে ওএমএসের ডিলার এনে দেওয়ার কথা বলে দীপক কুমার বর্মণ প্রিন্স ভাই এক লাখ টাকা চান। পরে আমার স্ত্রীর হাতের বালা বন্ধক রেখে এক লাখ টাকা জোগাড় করে তাঁর হাতে দিই। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাকে ডিলারও দেওয়া হয়নি, টাকাও ফেরত পাইনি।"


অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাগবত আশ্রমের একজন ভক্ত জানান—গত ৫ আগস্টের পর ভাগবত আশ্রম কমিটির মধ্যে সাংগঠনিক সমস্যা দেখা দিলে আশ্রমের ভক্তবৃন্দরা বর্তমান সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের স্মরণাপন্ন হন। পরে তিনি দীপক কুমার বর্মণ (প্রিন্স) কে বিষয়টি দেখে সহযোগিতা করার দায়িত্ব দেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রিন্স কমিটি করে দেওয়ার নামে উভয় পক্ষের কাছ থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন।


স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে—নরসিংদী জেলা বিএনপির এই মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ও তার শ্যালক জেলা ছাত্র দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক কিশান দাস পার্থ তাদের দলীয় পদের ক্ষমতা দেখিয়ে সনাতনী সম্প্রদায় ও বিভিন্ন রোগাক্রান্ত ব্যবসায়ীকে মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এলাকার একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী তাদের এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।


অভিযুক্তের বক্তব্য ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া:

আনীত সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে অভিযুক্ত দীপক কুমার বর্মণ (প্রিন্স) বলেন—"বরাদ্দকৃত টাকা মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সজয় দাস জানেন। আপনার কোনো কিছু জানতে হলে ওনার সাথে যোগাযোগ করেন।" তবে মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সজয় দাস তার বক্তব্য নাকচ করে দিয়ে বলেন—"আমরা জানতে পেরেছি কে বা কারা আমাদের মন্দিরের বরাদ্দকৃত টাকা স্বাক্ষর করে নিয়ে এসেছে। তবে এখনো আমরা সরকারি কোনো অনুদানের টাকা পাইনি।"


এই বিষয়ে জেলা বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা নোমান আহমেদ বলেন—"মসজিদ-মন্দিরসহ উপাসনালয় গুলোতে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এছাড়াও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সদর-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন দুর্নীতি, চাঁদাবাজ এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। মন্দিরে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।"


সর্বশেষ নরসিংদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা জাহান সরকার জানান—"বিষয়টি আমি লোকমুখে শুনেছি, তবে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে গভীর তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা দেখা হবে।"

আরও সংবাদ
দেখানো হচ্ছে ১ থেকে ১২ পর্যন্ত ফলাফল
  • ...
  • ৮৯

একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *

logo

প্রকাশক :

কাউসার আহমেদ অপু
যোগাযোগ করুন

অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯

ই-মেইল : info@newstime.net

আমাদের অনুসরণ করুন
২০২৪-২০২৬ নিউজ টাইম- সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Creating Document, Do not close this window...