দুর্ঘটনা না ঘটলে কি বীমার টাকা নষ্ট হয়? জানুন কীভাবে কম খরচে বড় আর্থিক ঝুঁকি এড়ানো যায় এবং বাংলাদেশে বীমার গুরুত্ব কতটা।
ধরুন, আপনার গাড়ি বা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। দীর্ঘদিন গাড়ি চালিয়েও হয়তো বড় কোনো দুর্ঘটনায় আপনি পড়েননি। তাহলে প্রতি বছর অযথা বীমার প্রিমিয়াম দিয়ে যাবেন কেন? বাইরে থেকে দেখলে প্রশ্নটি বেশ যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। তবে বীমার আসল হিসাব দুর্ঘটনা ঘটবে কি না শুধু সেটির ওপর নির্ভর করে না; বরং মূল বিষয় হলো—যদি দুর্ঘটনা ঘটেই যায়, তবে সেই ক্ষতির পুরো আর্থিক ধাক্কা আপনি একা সামলাতে পারবেন তো?
ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনেকেই একটি সাধারণ ভুল করেন—কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম দেখলে সেটির গুরুত্বও কম ধরে নেন। অথচ ঝুঁকি বিশ্লেষণে সম্ভাবনা এবং ক্ষতির পরিমাণ দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম হতে পারে, কিন্তু সেটি ঘটলে যদি কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়, তবে তা আপনার পুরো জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মতে, বীমা মূলত এই অনিশ্চিত বড় ক্ষতিকে একটি ছোট ও পূর্বনির্ধারিত প্রিমিয়াম খরচে রূপান্তর করার আধুনিক ব্যবস্থা।
আরও পড়ুন: লোডশেডিংয়ে বিদ্যুৎ ছাড়াই ঘর ও শরীর ঠান্ডা রাখার ৭ বিজ্ঞানসম্মত উপায়
অনেকের ধারণা বীমা একটি সঞ্চয় স্কিম, যেখানে সবাই টাকা জমা দিয়ে সমান রিটার্ন পাবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বীমার মূল নীতি হলো 'ঝুঁকি পুলিং' এবং 'ল অব লার্জ নাম্বার্স' (Large Numbers Principle)।
ঝুঁকি পুলিং: অনেক মানুষের ঝুঁকি এক জায়গায় এনে একটি তহবিল বা 'পুল' গঠন করা হয়।
ক্ষতিপূরণ: দুর্ঘটনাবশত যার ক্ষতি হয়, তাকে ওই পুল থেকে চুক্তি অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
সুবিধা: একজনের পক্ষে যা সামলানো অসম্ভব, তা বহু মানুষের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে প্রত্যেকের আগাম খরচ অনেক কমে আসে।
আগুন না লাগলে যেমন ফায়ার এক্সটিংগুইশার কেনার টাকা 'নষ্ট' হয়েছে বলা যায় না, তেমনি দাবি বা ক্লেইম না করা মানেই প্রিমিয়ামের টাকা নষ্ট হওয়া নয়। বীমার প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পায় বিপদের মুহূর্তে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বীমা খাতের অবদান এখনো বেশ সীমিত। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রিমিয়াম ও জিডিপির অনুপাত মাত্র ০.২ থেকে ০.৫ শতাংশের কাছাকাছি, যা ভারত বা ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক কম।
এর মূল কারণ বীমা সচেতনতার অভাব এবং দাবি নিষ্পত্তি নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট। অথচ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঝুঁকির দেশে বীমা হতে পারে পরিবার ও ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক নিরাপত্তা।
বীমা মানেই একের পর এক পলিসি নেওয়া নয়। ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুই ধরনের ঝুঁকি আলাদা করতে হবে:
১. ছোটখাটো ক্ষতি: যা আপনার জরুরি তহবিল বা সঞ্চয় দিয়েই সামলানো সম্ভব (যেমন: সামান্য মেরামত)।
২. মেজর আর্থিক ক্ষতি: যা বহু বছরের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে বা ঋণে ডুবিয়ে দিতে পারে (যেমন: বড় চিকিৎসা ব্যয়, দুর্ঘটনা বা আকস্মিক মৃত্যু)।
যে ক্ষতি আপনি নিজের পকেট থেকে সামলাতে পারবেন না, সেখানেই বীমা বা 'ঝুঁকি স্থানান্তরের' যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী। সঠিক কভারেজ ও শর্ত বুঝে পলিসি নেওয়া গেলে এটি কোনো অপ্রয়োজনীয় খরচ নয়, বরং ভবিষ্যতের বড় অনিশ্চয়তার বিপরীতে একটি সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...