নদীভাঙন কি শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কাঠামোগত দুর্নীতি? পদ্মা অববাহিকার চরাঞ্চল ও নদী ব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতায় নদীভাঙন কেবল একটি ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; এটি এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের নাম। বিশেষ করে পদ্মা নদী অববাহিকার চরাঞ্চলগুলোতে এই সংকট কেবল প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং মানবসৃষ্ট নীতিগত ব্যর্থতা এবং অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার ফলে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার চক্র তৈরি করেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাকি মানবসৃষ্ট বিপর্যয়?
নদীভাঙনকে সাধারণত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তবে এর বিস্তার বহুলাংশে প্রশাসনিক দুর্বলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলির অসম বণ্টন এবং ড্রেজিং কার্যক্রমের নামে অপরিকল্পিত প্রকল্পের সমন্বিত প্রভাবেই নদীভাঙন ত্বরান্বিত হয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় শিকার চরাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের জীবনে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রায় অনুপস্থিত।
| আরো পড়ুন: চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ বিপর্যয়: ৬ কেন্দ্র বন্ধ, লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন বিপন্ন |
‘লিমিনাল স্পেস’ ও অদৃশ্য নাগরিকত্ব
চরাঞ্চল এমন এক জায়গা যেখানে স্থায়িত্ব ও অস্থায়িত্বের দ্বৈধ সহাবস্থান। এখানে জমির মালিকানা যেমন অনিশ্চিত, তেমনি সামাজিক নিরাপত্তাও ভঙ্গুর। চরবাসীরা কার্যত একটি ‘অদৃশ্য নাগরিকত্বে’ বসবাস করে। তাদের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে আংশিক স্বীকৃত হওয়ায় তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে।
নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতি অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বাড়িয়ে নগর বস্তির বিস্তার ও সামাজিক বৈষম্যকে জটিল করে তোলে। তবে এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ‘মৌসুমি প্রশাসনিক অর্থনীতি’।
জরুরি প্রকল্প ও বরাদ্দ: বর্ষা মৌসুমে ত্রাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হয়।
দুর্নীতির চক্র: গবেষণা বলছে, এই বরাদ্দের বড় অংশ অপচয় ও দুর্নীতির মাধ্যমে নষ্ট হয়। দুর্যোগকে একটি ‘মৌসুমি আয়ের উৎস’ হিসেবে ব্যবহার করে এক অসাধু চক্র, যাকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’ বলা যেতে পারে।
সমাধানের পথ: টেকসই গভর্নেন্স
অস্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি কাঠামো প্রয়োজন।
১. টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদী শাসন: প্রকৌশলগত ত্রুটিমুক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো।
২. পরিকল্পিত পুনর্বাসন: বিকল্প জীবিকা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
৩. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: দুর্যোগকালীন বরাদ্দের প্রতিটি পয়সার হিসাব নিশ্চিত করা।
নদীভাঙনকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে হবে না; এটি একটি ‘গভর্নেন্স ইস্যু’। অন্যথায় এটি কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতীক হিসেবেই থেকে যাবে—যেখানে সাধারণ মানুষ হারাবে ভিটেমাটি, আর অসাধু চক্র লুটে নেবে মুনাফা।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...