ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের জোরপূর্বক পুশইন এবং অনুপ্রবেশের রাজনৈতিক প্রচারণার পেছনের আসল সত্য উন্মোচন করলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক হাবিব বাবুল।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে নতুন করে যে উত্তেজনার পারদ চড়ানো হচ্ছে, তা কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কোনো সাধারণ ত্রুটি নয়। এটি মূলত মানবাধিকার লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক আইনের অবমাননা, আঞ্চলিক কূটনীতির অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার এক জটিল ও গভীর সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বিএসএফ কর্তৃক সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার (পুশব্যাক) অপচেষ্টা পরিস্থিতিকে চরম উদ্বেগজনক করে তুলেছে। তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি কড়া পাহারায় এমন একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশের চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। সীমান্তের জিরো পয়েন্টে দিনের পর দিন আটকে পড়া নারী, শিশু ও পুরুষদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র শুধু দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের জন্যই অশনিসংকেত নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় মানবিক ও আইনি মানদণ্ডকে এক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটি কোনো প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্প। আরএসএস-বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় জনমনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করছে যে, ভারতে কোটি কোটি ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বাস করছে, যারা সে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জনসংখ্যার ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি। অথচ এই পর্বতসম দাবির পক্ষে ভারতের কোনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য বা স্বচ্ছ কোনো সরকারি পরিসংখ্যান দেখাতে পারেনি।
বরং এই রাজনৈতিক প্রচারণার ফলে এমন এক বিপজ্জনক সামাজিক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছে, যেখানে বাংলাভাষী মুসলিম পরিচয়কেই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে খোদ ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদেরও ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে অপরাধী বানানোর চেষ্টা চলছে। ফলে সীমান্ত রাজনীতির সাথে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ যুক্ত হয়ে পুরো বিষয়টিকে আরও বিষাক্ত করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ
এই জটিল পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে—আন্তর্জাতিক আইন কি এই জোরপূর্বক পুশইন সমর্থন করে? উত্তর হলো—একদমই না। জাতিসংঘের বিভিন্ন কনভেনশন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রই ইচ্ছামতো কাউকে সীমান্তে এনে অন্য দেশে ঠেলে দিতে পারে না। একজন ব্যক্তিকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক:
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয়তা দ্বিপক্ষীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিপরীতে আত্মপক্ষ সমর্থনের আইনি সুযোগ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপর রাষ্ট্রের স্পষ্ট সম্মতি ও কূটনৈতিক প্রটোকল মানতে হবে।
কাউকে কোনো প্রকার বিচার বা যাচাই-বাছাই ছাড়া রাতের অন্ধকারে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (ICCPR) অনুযায়ী ‘সমষ্টিগত বহিষ্কার’ (Collective Expulsion)-এর শামিল, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম পরিপন্থী। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত। যদি সত্যিই কেউ বাংলাদেশি নাগরিক হন এবং তিনি অবৈধভাবে ভারতে থাকেন, তবে দুই দেশের যৌথ যাচাইয়ের মাধ্যমে তাঁকে সম্মানের সাথে ফেরত পাঠানো সম্ভব। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।
মিডিয়ার ভূমিকা ও আত্মঘাতী পথ
দীর্ঘ সীমান্ত, দারিদ্র্য এবং মানব পাচারের কারণে সীমান্তে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পারাপারের ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু তার সমাধান রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছড়ানো নয়। ভারতের একটি বড় অংশের মূলধারার মিডিয়া এই ইস্যুটিকে এমনভাবে প্রচার করছে, যেন এটি তাদের দেশের অস্তিত্বের লড়াই। তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান বা মানবিক দিককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি করা এই উত্তেজনাকর প্রচারণা দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত আত্মঘাতী।
সংকট থেকে উত্তরণের ৪টি প্রধান পথ:
১. কূটনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক: সীমান্তে যেকোনো ধরণের প্রত্যাবাসন বা পুশব্যাক প্রক্রিয়া অবিলম্বে একতরফা বন্ধ করে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক কাঠামোর অধীনে আনতে হবে। বিএসএফ ও বিজিবির স্থানীয় ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে।
২. যৌথ বায়োমেট্রিক যাচাই: যাদেরকে বাংলাদেশি দাবি করা হচ্ছে, তাদের পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক ডেটা এবং স্থানীয় তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে যৌথভাবে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষভাবে সীমান্তের জিরো পয়েন্টের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আইনি সুযোগ দিতে হবে।
৪. বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বন্ধ: রাজনৈতিক স্বার্থে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘অবৈধ’ বা ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করার এই নোংরা খেলা বন্ধ করতে হবে।
কাঁটাতারের সীমান্তরেখা দুটি রাষ্ট্রকে বিভক্ত করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের মানবিক দায়বদ্ধতাকে নয়। নারী, শিশু ও অসহায় মানুষকে কাঁটাতারের মাঝে আটকে রেখে কোনো রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত নৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারে না। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো উত্তেজনা কমানো এবং সংঘাতের বদলে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে স্থায়ী সমাধান খোঁজা।
(হাবিব বাবুল: জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...