আমাদের সমাজে বিবাহকে ঘিরে গায়ে হলুদ, উকিল বাপ, যৌতুক ও বরযাত্রী খাওয়ানোসহ ৩০টি প্রধান কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনীর বইয়ের আলোকে বিস্তারিত গাইড।
বর্তমান সমাজে বিয়েকে ঘিরে ধর্মীয় অনুশাসনের চেয়ে লৌকিকতা, কুসংস্কার ও ভিনদেশী সংস্কৃতির প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ভুল রেওয়াজকে বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করা হয়, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনী রচিত ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিয়ে ও তালাক’ গ্রন্থের আলোকে বিয়ের সময় সমাজে প্রচলিত এমন ৩০টি প্রধান কুসংস্কার ও অনৈসলামিক প্রথা নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. অনাত্মীয় পুরুষদের পাত্রী দেখা: ইসলামে কেবল পাত্র নিজে অথবা তার মা-বোনের মতো নারী আত্মীয়দের পাত্রী দেখার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু পাত্রের ভাই, বন্ধু, চাচা বা মামাদের পাত্রী দেখতে যাওয়া শরীয়ত পরিপন্থী।
২. গায়ে হলুদ উৎসব: গায়ে হলুদের নামে নাচ-গান, উচ্চ শব্দে বাজনা এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার যে কালচার তৈরি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
৩. আড়ম্বরতা ও অপব্যয়: লোকদেখানো জাঁকজমক করতে গিয়ে অনেকে সুদে ঋণ নেন। অথচ ইসলামে সবচেয়ে কম খরচে সম্পন্ন হওয়া বিয়েকে সবচেয়ে বেশি বরকতময় বলা হয়েছে।
৪. অবাধ মেলামেশা: বিয়ের অনুষ্ঠানে বেগানা যুবক-যুবতীদের আড্ডা, একসঙ্গে নাচ-গান ও সিনেমা দেখার সংস্কৃতি আধুনিকতার নামে এক বড় ধর্মীয় অবক্ষয়।
৫. যৌতুক প্রথা: এটি একটি মারাত্মক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিশাপ। যৌতুকের দাবিতে কনেপক্ষের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটে, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম।
৬. গান-বাজনা: বিয়ের উৎসবে বাদ্যযন্ত্র বাজানো এবং ডিজে পার্টির নামে গান-বাজনা করা পুরোপুরি নাজায়েজ।
৭. 'উকিল বাপ' প্রথা: সমাজে কোনো দূর সম্পর্কের ব্যক্তিকে আসল বাপের মতো মর্যাদা দিয়ে 'উকিল বাপ' বানানো হয় এবং পর্দা লঙ্ঘন করা হয়। ইসলামে এমন মনগড়া সম্পর্কের ভিত্তি নেই। মেয়ের প্রকৃত অভিভাবকই (বাবা, চাচা বা ভাই) তার আইনগত উকিল হবেন।
৮. পাত্রকে সোনার আংটি পরানো: বিয়ের আসরে বরের আঙুলে সোনার আংটি পরানোকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করা হয়। অথচ পুরুষদের জন্য স্বর্ণের ব্যবহার সম্পূর্ণ হারাম।
৯. মোহর মাফ করানো: মোহর কনের আইনি ও ধর্মীয় অধিকার। বাসর রাতে জোরপূর্বক বা আবেগঘন পরিবেশে স্ত্রীর কাছ থেকে মোহর মাফ করিয়ে নেওয়ার যে চল রয়েছে, তাতে মোহর মাফ হয় না; এটি অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে।
১০. ভাবিদের মাধ্যমে বরের গোসল: বিয়ের দিন ভাবিরা মিলে বরকে গোসল করানোর যে প্রথা দেশে চালু আছে, তা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ।
১১. শ্যালিকা কর্তৃক হাত ধোয়ানো: বিয়ের আসরে প্রাপ্তবয়স্কা শ্যালিকা কর্তৃক বরের হাত ধুয়ে দেওয়ার রেওয়াজটি বেপর্দা এবং শরীয়ত পরিপন্থী।
১২. দিন-তারিখকে অশুভ মনে করা: নির্দিষ্ট কোনো দিন, মাস বা তারিখে বিয়ে করাকে অমঙ্গল বা অশুভ মনে করার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই।
১৩. কদমবুসি ও সিঁদুর-কুলার প্রথা: বিয়ের পর বর-কনের ঢালাওভাবে মুরুব্বিদের পা ছুঁয়ে সালাম করা এবং কুলায় ধান-সিঁদুর নিয়ে প্রদীপ জ্বালানো মূলত ভিনদেশী ও ধর্মীয় কুসংস্কারের অংশ।
১৪. পালকপুত্রের প্রাক্তন স্ত্রীকে বিয়েতে বাধা: পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা ইসলামে বৈধ হলেও সমাজ একে নেতিবাচক চোখে দেখে, যা জাহেলী যুগের মানসিকতা।
১৫. বিধবা বিবাহে কটূক্তি: সমাজে বিধবা নারীদের পুনঃবিবাহকে বাঁকা চোখে দেখা হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রায় সব স্ত্রীই বিধবা ছিলেন। তাই একে ঘৃণ্য মনে করা গুনাহের কাজ।
১৬. ফাঁদে ফেলে অসম বিয়ে: বয়োবৃদ্ধ লোক কর্তৃক অর্থ বা ক্ষমতার জোরে অল্প বয়সী মেয়েদের বাধ্য করে বিয়ে করা এক ধরনের জুলুম, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
১৭. লোকলজ্জার ভয়ে বিয়ে না করা: স্ত্রী মারা যাওয়ার পর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও 'সমাজ কী বলবে' এই ভয়ে অনেকে বিয়ে করেন না, যা সমাজে ব্যভিচারের পথ তৈরি করে।
১৮. পিরিয়ড চলাকালীন বিয়ে অসিদ্ধ ভাবা: অনেকের ধারণা পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব চলাকালীন বিয়ে শুদ্ধ হয় না। এটি ভুল ধারণা; এই অবস্থায় বিয়ে সহিহ হলেও সহবাস করা নিষিদ্ধ।
১৯. জোরপূর্বক বরযাত্রীর খাওয়া-দাওয়া: কনেপক্ষের সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও সামাজিক চাপের মুখে শত শত বরযাত্রী নিয়ে গিয়ে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করানো এক ধরনের জোরজুলুম ও নাজায়েজ কাজ।
২০. কনের মুখ দেখানো: বিয়ের অনুষ্ঠানে অনাত্মীয় বা বেগানা পুরুষদের সামনে এনে লাইন ধরে কনের মুখ দেখানোর প্রথাটি সম্পূর্ণ হারাম।
২১. সালামি বা যৌতুকের ছদ্মবেশ: বিয়ের নামে জোর করে বা নিয়ম বানিয়ে বাধ্যতামূলক উপহার বা সালামি আদায় করা এক প্রকার সামাজিক কুপ্রথা।
২২. লোকদেখানো ওলিমা: সুন্নাহ পালনের উদ্দেশ্যে ওলিমা (বউভাত) না করে সমাজে নিজের প্রভাব ও বড়ত্ব প্রকাশের জন্য রাজকীয় আয়োজন করা সমীচীন নয়।
২৩. ইবাদতে উদাসীনতা: বিয়ের উৎসবের ব্যস্ততায় ফরয নামায বা অন্যান্য ওয়াজিব ইবাদত কাজা করা বা ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত বড় গুনাহের কাজ।
২৪. জামাতার সামনে বেগানা নারীদের আসা: শ্বশুরবাড়ির অনাত্মীয় মহিলারা নতুন জামাতার সামনে পর্দা ছাড়া দেদারসে যাতায়াত করেন, যা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ।
২৫. বাধ্যতামূলক তিনবার কবুল বলা: বর-কনেকে দিয়ে জোর করে তিনবার 'কবুল' বলানো জরুরি মনে করা হয়। আসলে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী মাত্র একবার স্পষ্ট করে বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়।
২৬. দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দেওয়া: বিয়ে শেষ হওয়া মাত্রই বরকে পুরো মজলিসের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিতে বাধ্য করার প্রথাটির কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই।
২৭. বরযাত্রার আগে কবর জিয়ারত বাধ্যতামূলক ভাবা: বর রওয়ানা হওয়ার ঠিক আগেই মৃত বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করাকে আবশ্যক মনে করা মানুষের মনগড়া নিয়ম। কবর জিয়ারত যেকোনো সাধারণ সময়েই করা যায়।
২৮. অন্দরমহলে বরকে নিয়ে খেল-তামাশা: বিয়ের পর কনে বিদায়ের আগে পাড়ার যুবতী মেয়েরা বরকে ভেতরে এনে বিভিন্ন খেলা ও ঠাট্টা-তামাশায় মেতে ওঠে, যা বেপর্দা ও নাজায়েজ।
২৯. পর্বভিত্তিক ইফতারি বা ফল পাঠানো: রমজানে ইফতারি কিংবা জ্যৈষ্ঠ মাসে আম-কাঁঠাল মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোকে বাধ্যতামূলক মনে করা এক ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কোপ। সামর্থ্য না থাকলেও অনেকে ঋণ করে এটি করেন, যা অনুচিত।
৩০. কনেকে কোলে করে গাড়ি থেকে নামানো: বিয়ের পর কনেকে গাড়ি থেকে নামানোর সময় অনাত্মীয় বা বেগানা পুরুষদের মাধ্যমে কোলে করে নামানো বা ঘরে তোলা চরম অভদ্রতা ও সম্পূর্ণ হারাম।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...