বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কেন হয় বজ্রপাত? এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং বাঁচার উপায় নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন এই এই প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়। বিশেষ করে হাওর অঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলের কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ এই দুর্যোগের প্রধান শিকার হচ্ছে। গত এক দশকে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে, যা বর্তমানে জননিরাপত্তার অন্যতম বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বজ্রপাত কেন হয়? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
বজ্রপাত মূলত মেঘের মধ্যে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক শক্তির হঠাৎ নির্গমনের ফল। যখন আকাশে বিশাল আকৃতির কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ তৈরি হয়, তখন মেঘের ভেতরে বরফকণা, জলকণা ও বায়ুর তীব্র ঘর্ষণের ফলে বিপুল পরিমাণ স্থির বিদ্যুৎ বা ইলেকট্রিক চার্জ উৎপন্ন হয়।
মেঘের উপরের অংশে সাধারণত ধনাত্মক (+) এবং নিচের অংশে ঋণাত্মক (-) চার্জ জমা হয়।
যখন এই দুই চার্জের পার্থক্য অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়, তখন মেঘের মধ্যে কিংবা মেঘ ও ভূমির মধ্যে বিদ্যুৎ নির্গত হয়। এই শক্তিশালী বিদ্যুৎ নির্গমনই হলো বজ্রপাত।
বজ্রপাতের সময় তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়েও বেশি। এই তীব্র তাপের কারণে বাতাস দ্রুত প্রসারিত হয়ে যে প্রচণ্ড শব্দ তৈরি করে, তাকেই আমরা বজ্রধ্বনি বলি।
সরকারি ও বেসরকারি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩৫০ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ৩,৮৪৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু বছরের পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
২০১৬ সাল: ৩৯১ জন (এক দিনেই মারা যান ৮০ জন)
২০১৮ সাল: ৩৫৯ জন
২০২২ সাল: ৩৪৬ জন
২০২৩ সাল: ৩৪০ জন
২০১৬ সালে একদিনে রেকর্ড সংখ্যক মৃত্যুর পর সরকার বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' হিসেবে ঘোষণা করে। মৃতদের প্রায় ৯০ শতাংশই গ্রামীণ জনপদের মানুষ।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও সময়
ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের কিছু এলাকা বজ্রপাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে:
সিলেট অঞ্চল: সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওর এলাকা।
উত্তরাঞ্চল: উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো এবং উন্মুক্ত জলাভূমি।
ঝুঁকিপূর্ণ সময়: এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এই সময় কালবৈশাখী ও আর্দ্র বায়ুর সংঘর্ষে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয়।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার কার্যকর উপায়
১. নিরাপদ আশ্রয়: আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে বা বিজলি চমকালে দ্রুত পাকা দালান বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা আছে এমন স্থানে আশ্রয় নিন।
২. গাছের নিচে নয়: বৃষ্টির সময় কখনোই বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা টাওয়ারের নিচে দাঁড়াবেন না। এটি অত্যন্ত বিপদজনক।
৩. খোলা মাঠ ও জলাশয়: মাঠে কাজ করলে বা নৌকায় থাকলে দ্রুত সমতলে বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসুন। খোলা জায়গায় আটকে পড়লে দুই পা কাছাকাছি রেখে নিচু হয়ে বসে থাকুন, তবে মাটিতে শুয়ে পড়বেন না।
৪. ইলেকট্রনিক্স ব্যবহার: বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা কোনো ধাতব বস্তু ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা নিরাপদ।
বজ্রপাত মোকাবিলায় ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ জরুরি:
লাইটনিং অ্যারেস্টার: গ্রামাঞ্চলের স্কুল, মসজিদ, বাজার ও খোলা মাঠে প্রচুর পরিমাণে বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা।
আগাম সতর্কবার্তা: আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে অন্তত ১০-৩০ মিনিট আগে স্থানীয়ভাবে সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
বনায়ন: ব্যাপকভাবে তালগাছ ও উঁচু গাছ রোপণ করা, যা প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করে।
বজ্রপাত প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক ঘটনা হলেও সঠিক সচেতনতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এর প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সময়মতো সতর্কতা এবং উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থাই পারে এই ‘আকাশী দুর্যোগ’ থেকে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করতে।
লেখক: রাহমান তৈয়ব, শিক্ষক, সুনামগঞ্জ, সিলেট।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...