চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এর আসল নাম ‘স্কোপোলামিন’ (Scopolamine)। এটি মূলত ধুতরা ফুল ও বেশ কিছু উদ্ভিদের নির্যাস এবং রাসায়নিক যৌগের সংমিশ্রণে তৈরি একধরনের পাউডার বা তরল দ্রবণ।
আশির দশকের কোনো এক সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রে দেখা যেত—এক অদ্ভুত কেমিক্যালের ঘ্রাণ নাকের কাছে আসতেই মানুষের নিজের মস্তিষ্কের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। যা বলা হচ্ছে, রোবটের মতো সে ঠিক তা-ই করে যাচ্ছে! এত দিন যেটিকে সিনেমার কাল্পনিক গল্প মনে করা হতো, আজ সেটাই আমাদের বাস্তব জীবনের এক ভীতিজনক আতঙ্কের নাম—‘স্কোপোলামিন’, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে ‘শয়তানের নিশ্বাস’ বা ‘Devil’s Breath’ নামে!
কোনো আঘাত নয়, কোনো মারধর নয়—স্রেফ এক তুড়িতে বা কাগজের টুকরো নাকের কাছে এনে বাতাস ফুঁ দেওয়ার ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে সংবিত হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অপরাধীরা যা বলছে, নিজের ইচ্ছায় কানের দুল, গলার চেইন বা মোবাইল তাদের হাতে তুলে দিয়ে পরে ঘোর কাটলে কাঁদছেন ভুক্তভোগীরা। বাংলাদেশে সম্প্রতি চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানীর একাধিক জায়গায় এই স্কোপোলামিন বা ‘শয়তানের নিশ্বাস’ ব্যবহার করে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের কার্যকরী উপায় ও ঘরোয়া সতর্কতা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এর আসল নাম ‘স্কোপোলামিন’ (Scopolamine)। এটি মূলত ধুতরা ফুল ও বেশ কিছু উদ্ভিদের নির্যাস এবং রাসায়নিক যৌগের সংমিশ্রণে তৈরি একধরনের পাউডার বা তরল দ্রবণ। ঔষধ শিল্পে পরিমিত মাত্রায় এর কিছু ব্যবহার থাকলেও, অপরাধীরা এর অতিমাত্রায় অপব্যবহার শুরু করেছে। এটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে নাকের ৪ থেকে ৬ ইঞ্চির কাছাকাছি এলেই বাতাসের টানে ফুসফুসে প্রবেশ করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষকদের মতে, এটি মস্তিষ্কে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মেমোরি ও কগনিটিভ ফাংশন (চিন্তা করার ক্ষমতা) পুরোপুরি ব্লক করে দেয়। ভুক্তভোগী সজাগ থাকেন, হাঁটতে-চলতে পারেন কিন্তু ভালো-মন্দের বিচারবুদ্ধি শূন্য হয়ে যায়। ফলে অপরাধী তাকে যা নির্দেশ দেয়, সে হুবহু তাই পালন করে।
বাংলাদেশে এই ড্রাগের উপস্থিতি প্রথম পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হয় নারায়ণগঞ্জের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ও ঢাকার অলিগলিতে এর একাধিক চাঞ্চল্যকর প্রয়োগ দেখা গেছে।
ভিজিটিং কার্ড বা কাগজের ফাঁদ: অপরিচিত কেউ হঠাৎ রাস্তায় আপনার পথ আটকে কোনো ঠিকানা বা এতিমখানায় দানের কথা বলে একটি কাগজ বা ভিজিটিং কার্ড আপনার চোখের বা নাকের সামনে ধরবে। লেখার হরফগুলো ছোট হওয়ায় আপনি স্বাভাবিকভাবেই তা পড়ার জন্য মুখের কাছে আনবেন—আর অমনি ঘটে যাবে বিপত্তি!
ফোনের স্ক্রিন বা কাপড়ের ফাঁদ: সিএনজি, বাস বা গণপরিবহনে সহযাত্রী সেজে মোবাইলের স্ক্রিন দেখানো কিংবা মুখের সামনে রুমাল নাড়ানোর মাধ্যমে অপরাধীরা অলক্ষ্যে পাউডার বাতাসে ছড়িয়ে দেয়।
কুরিয়ার ও অনলাইন চক্র: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যম ও কুরিয়ার সার্ভিসের আইনের ফাঁক গলে এই বিপজ্জনক রাসায়নিক দেশে আসছে এবং কতিপয় অপরাধী চক্র অনলাইনে গোপনে তা কেনাবেচা করছে।
আরও পড়ুন: মোটরবাইকে অভিনব উপায়ে ইয়াবা পাচার, অতঃপর পুলিশের জালে ‘বাইকার গ্যাং’-এর ৬ সদস্য
শয়তানের নিশ্বাস যেহেতু চোখে দেখা যায় না এবং মুহূর্তের মধ্যে প্রভাব ফেলে, তাই এটি থেকে বাঁচতে একমাত্র অস্ত্র হলো ‘ব্যক্তিগত সতর্কতা’। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিশেষ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি এমন ঘোরলাগা পরিস্থিতির শিকার হন বা সন্দেহজনক কোনো আচরণ দেখতে পান, তবে দেরি না করে নিকটস্থ থানা অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিয়ে পুলিশকে অবহিত করুন। নীরব থাকা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। একটু সচেতনতাই পারে আপনাকে ও আপনার স্বজনদের এই বিপজ্জনক 'শয়তানের নিশ্বাস' থেকে সুরক্ষিত রাখতে।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে *
অফিস (বাংলাদেশ) : ক-২৭১, ১০ম তলা, রংধনু কর্পোরেট অফিস, কুড়িল বিশ্বরোড, ঢাকা-১২২৯
ই-মেইল : info@newstime.net
Creating Document, Do not close this window...